blogger widgets
শুভ্র ভাই এর লেখালেখির জগতে স্বাগতম! Welcome!

লাইফ উইদাউট লাভ - পর্বঃ ০৩

দুই রুমের ছোট্ট একটা ফ্লাট নিয়ে থাকি। এক রুমেই আমার দিব্যি চলে যায়। বাকী রুমটা ফাঁকা পড়ে থাকে। মাঝে মাঝে সাবলেট হিসেবে ভাড়া দেয়ার চিন্তাভাবনা করিকিন্তু ভাবনাটাকে আর বাস্তবায়ন করা হয়ে ওঠে নাআমি নিজে মোটামুটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করি। কিন্তু ফ্লাটটাকে পরিষ্কার রাখা হয়ে ওঠে না। ভাইয়া ভাবী রুমে ফ্রেশ হচ্ছে। আমি এরই মাঝে গ্যাসের চুলায় চায়ের পানি বসিয়ে দিলাম। খুব চায়ের তেষ্টা পেয়েছে। অনেকক্ষণ চা খাওয়া হয় নাই  কাজের বুয়া নাই। কাজের বুয়া রাখার সাহস করি না। একলা থাকি। কবে দেখবো এলাকার বখাটে ছেলে গুলো চাঁদাবাজির আশায় কাজের বুয়ার সাথে আমার অনৈতিক সম্পর্ক ইত্যাদি দিয়ে বাজার গরম করে ফেলেছে। একটা ছেলে আছে। সে এক দুই দিন বাদে ঘরদোর ঝাড়ু দিয়ে যায়, বাজার সদাই করে। ছেলেটার একটা জিনিস ভালো লাগে। তার চুরি করার অভ্যাস নেই। আমি মোটামুটি নিজের কাজ চালিয়ে নেয়ার রান্না করতে পারি। একদম খেয়াল ছিলো না দ্বীপ্ত ভাইয়ারা আসার সাথে সাথে খাবার দিতে হবে। এই বেলা রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার নিয়ে আসি। রাতে দেখা যাবে। বেরোতে যাবো এই সময়ে ভাবী কিচেনে এসে হাজির । কাপ ধুয়ে চা ঢেলে নিলেন। 

‘শুভ্র,  কোথায় যাও?

‘এই তো ভাবী একটু বাইরে যাই। কাছেই একটা রেস্তোরাঁ আছে। কিছু খাবার নিয়ে আসি।

‘ রেস্তোরাঁ। বেশ। আজকাল কিন্তু কেউ বাংলা বলতে চায় না। ইংরেজী বলা যেন একটা ফ্যাঁশান হয়ে গেছে। সবার মুখে রেস্টুরেন্ট শুনি। বহুদিন বাদে রেস্তোরাঁ শুনে ভালো লাগলো। তাই বলে দেশে এসে দোকানের খাবার খাবো? এইটা কি বলো শুভ্র! ফ্রিজে বাজার করা আছে?

আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম, “আছে”ভাবী তখনি কোমরে শাড়ীর আঁচল জড়িয়ে ফ্রিজের দিকে এগিয়ে গেলেন।  

‘ এত দূরের পথ জার্নি করে এসেছেন ভাবী। এখন থাক। খেয়েই দেখেন না ঢাকাইয়া রেস্তোরাঁর খাবার। আর রেস্তোরাঁ কিইন্তু মোটেও বাংলা শব্দ না ভাবী।

‘  আরে রাখো তো তোমার জার্নি। এখন আর জার্নিকে জার্নি মনে হয় না। তুমি এসে আমাকে দেখিয়ে দাও কোথায় কি রেখেছো

প্রেশার কুকারে মাংস চড়িয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলেন, শুভ্র বিয়ে করবে কবে? মাথার অবস্থা তো খারাপ। পুরোপুরি স্টেডিয়াম হয়ে গেলে তো মেয়ে পাবে না। তখন ক্রিকেট খেলার জন্য স্টেডিয়ামই ভাড়া দিতে হবে। মেয়ে দেখবো?

আমি কিছু বলার আগে দীপ্ত ভাইয়ার অট্টহাসির শব্দ পেলাম। তাকে একটু আগে চা দিয়ে এসেছি। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দরজা কপাটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “ঢেকি স্বর্গে গেলেও যেমন ধান ভাঙ্গে, তেমনি বাঙালী অবিবাহিত পাত্র পাত্রী পেলে বিনে পয়সায় ঘটকালী করে। নিউইয়র্কে তোর ভাবীকে সবাই ঘটক পাখি ভাবী বলে ডাকে। তিনি স্বেচ্ছাশ্রমে বেশ কয়েক যুগলের বিবাহ দিয়েছেন।” ভাবী ভাইয়ার উপর কপট রাগ ঝাড়েন, “তোমার এত জ্বলে কেন! তোমার বিয়ে দেই নাই বলে কি এত রাগ”
দ্বীপ্ত ভাইয়া এগিয়ে আসেন, প্লিজ কণা। এইটুকু দয়া করো। তোমার ঘটকালিতে বিয়ে করার শখ আমার অনেক দিনের।
কণা ভাবী, একটা বউ চালাতে পারো না। আবার আরেকটা বিয়ে করার শখ! পুরুষ মানুষের এই এক বদ রোগ। এক পা কবরে চলে যায় তবুও বিয়ের আশা ছাঁড়ে না।
দ্বীপ্ত ভাইয়াঃ কি কও কণাদুই পাই তো এক জায়গায় আছে। কোন পা কবরে?
কণা ভাবীঃ তোমার সাথে আর কথায় পারা যায় না।
দ্বীপ্ত ভাইয়াঃ আর তুমি শুভ্র’র সামনে এইডা কি কইলা! আমি বউ চালাইতে পারি না।



দ্বীপ্ত ভাইয়া কণা ভাবী ছোট বাচ্চাদের মত তর্ক জুড়ে দিলো। আজ অনেক দিন পর আমার ছোট্ট কিচেন গল্পে তর্কে সরগরম হয়ে উঠলো। ছোট বেলার এরকম কিছু স্মৃতি আছেতখন আমাদের বাড়ীতে মাটির চুলায় রান্না হত। অঘ্রাহায়ন পৌষে মাঠের ধান কাটা হয়ে যেত। শীতকালে রান্না ঘরের সামনের উঠানে খোলা আকাশের নিচে মাটিতে গর্ত খুড়ে চুলা পাতা হত। সেখানে ধানের খড় দিয়ে রান্না করতে বসতেন মাবাড়িতে মামা খালা নানী ফুফুদের কেউ এলে চুলায় পিঠে বসে যেত। রাজ্যের সব গল্প হত। আমি চুপটি করে গল্প শুনতাম।  

ভাবী রান্না শেষ করে ঘরে গেলেন। দীপ্ত ভাইয়া বললেন, “শার্টটা তোর কাছে আজো আছে?

আমি আমার গায়ের শার্টটার দিকে তাকালাম। ভেবেছিলাম দীপ্ত ভাইয়া চিনতে পারবে না। আকাশ নীল বর্ণের এই শার্ট। বহুবছর পরে আজ আমি পরেছি। বিকেলে কোন শার্ট পরে রিসিভ করতে যাবো সেটা নিয়ে বেশ সিদ্ধান্তহীনতায় পরে যাই। পোষাক আষাক নিয়ে আমি মোটেও খুঁতখুঁতে নই। একটা হলেই হয়। কিন্তু আজ অকারণেই খুঁতখুঁত করলাম। আলমারি থেকে কাপড় বের করতে করতে একসময় সবই বের করে ফেললাম। কাপড়ের ভিড়ে পরে ছিলো নীল শার্টটি। যেটার স্পর্শে আমি দ্বীপ্ত ভাইয়াকে অনুভব করি। এই শার্টটাই পরার সিদ্ধান্ত নিলাম।


রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ করতে দশটা বেজে গেলো। দ্বীপ্ত ভাইয়াদের ঘুমাতে দিলাম আমার রুমে। আমি পাশের রুমে শুয়ে পড়লাম। চোখের সামনে পুরোনো সেই দিনগুলো একে একে সিনেমার মত হাজির হচ্ছে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি এক শীতের সকালে মিয়াভাইয়ের সাথে তার হ্যান্ডসাম বন্ধু এলো আমাদের গ্রামে, পাথরখালিতে মাছ ধরা, শালিকখালি নদীতে এক জ্যোৎস্না স্নাত রাতে দুজনের কাছাকাছি আসা। নিঃশব্দে চোখের পাতায় ঘুম নেমে এলো। 

লাইফ উইদাউট লাভ - পর্বঃ ০২

আমার নিজের গাড়ী নেই। চাকুরি করে গাড়ি কেনার সামর্থ্য এখনো হয়ে ওঠে নাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে চাকরিতে ঢুকেছি বছর দুয়েক। বেতন মোটামুটি ভালই পাই। চলে যায়। দীপ্ত ভাইয়া বলতেন তোর মাস্টারি করা উচিত। এত বড় বড় চিঠি লিখিস। তোর ধৈর্য্য দেখে অবাক না হয়ে পারি না। আমার তো এক পাতা লিখতেই কলম ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। সেই স্কুলে পড়া দিনগুলোয় দীপ্ত ভাইয়াকে প্রতিদিন আমার একটা করে চিঠি লেখা চাই। দ্বীপ্ত ভাইয়া থাকতেন ঢাকায়। আর আমি থাকতাম সুন্দরবনের খুব কাছের এক নিভৃত গ্রামে। চিঠির মাধ্যমেই আমি কথা বলতাম দ্বীপ্ত ভাইয়ার সাথে। যখন চিঠি লিখতাম তখন মনে হত দ্বীপ্ত ভাইয়া আমার সামনেই বসে আছে। আমি তার সাথে মুখোমুখি কথা বলছি। দ্বীপ্ত ভাইয়ার চিঠি আসলো কিনা জানতে আমি প্রতিদিনই দুই মাইল দূরে পোস্ট অফিসে চলে যেতাম পায়ে হেঁটে পিয়ন কাকা মজা করে বলত, কি ব্যাপার শুভ্র মিয়া। গ্রামে আর কারো তো এত চিঠি আমি কারো আসতে দেখিনি এই চাকরি জীবনে। কোন মেয়ে ছেলের নাম ব্যবহার করে চিঠি লেখে নাকি তোমাকে?
               
ক্যাবে ভাইয়া আর ভাবী বসেছে পেছনে আর আমি সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে। আমার কোলে দীপ্ত ভাইয়ার রাজপুত্র। অক্ষর, দীপ্ত ভাইয়ার ছেলের নাম। আমার গলা জড়িয়ে ধরে বসে রাজ্যের সব প্রশ্ন করে যাচ্ছে। পদ্মা নদী কতদূরে? জেলেরা এখন ইলিশ ধরছে কিনা আমেরিকায় বাংলার চর্চা কতটা হয় আমার জানা নেই। তবে অক্ষরের মুখে বাংলার আধো টানটা আমার কানে বেশ মধুর লাগছে। তার বাংলা উচ্চারণ ঝরঝরে কিন্তু ভোকাবুলারি অত সমৃদ্ধ নয়। প্রতি সেন্টেন্সে ইংরেজী অক্ষরের ছড়াছড়ি। আমি তার কচি মুখের দিকে অপলকে চেয়ে থাকি বেশ কিছুক্ষন। বছর চারেক বয়স হবে অক্ষরের। তার মানে দ্বীপ্ত ভাইয়া বিয়ের বেশ পরে বাচ্চা নিয়েছেন।

ওপরের দিকে তাকাতে ভিউ গ্লাসে চোখ পড়ল। ভাবীও ঢাকা শহর দেখায় ব্যস্ত। জানালার কাছে চোখ নিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন। আর মাঝে মাঝে ভাইয়াকে প্রশ্ন করছেন। “আরে দেখ বনানী বাস স্ট্যান্ড। অনেকটা আগের মতই আছে না।” অনেক দিন পরে এসেছেন। অনেক কিছুই বদলে গেছে। তাই চেনা ঢাকাকে নতুন করে চেনার চেষ্টা করছেন। দীপ্ত ভাইয়ার চোখ ড্রাইভারের উপরের গ্লাসে। এভাবে কেন তাকাও দীপ্ত ভাইয়া! আর এভাবে তাকিয়ো না। মেঘে মেঘে অনেক  সময় পেরিয়ে গেছে। আমরা হয়তো টের পাইনি। এই ঢাকার মহাসড়কের উপর দিয়ে পার হয়ে গেছে হাজারো মানুষ, হাজারো সব গল্প। আমরা শত চাইলেও ফেলে আসা অতীতে আর ফিরে যেতে পারবো না। ভাবী বেশ বিরক্তি নিয়ে বললেন, “ঢাকার অনেক কিছুই চেঞ্জ হয়ে গেছে। পুরো রাস্তাটাই অচেনা লাগছে। চেনা চেনা লাগে আবার ঠিকে চেনাও যেন নয়। কিন্তু জ্যামটা চেঞ্জ হলো না। সেই আগের মত রাস্তায় ঘন্টার পর ঘন্টা  বসে থাকা। তোমার ফ্লাটে পৌঁছাতে আর কতক্ষণ লাগবে শুভ্র”  শীতের এই সন্ধ্যায় ঢাকার বুকে আজ হালকা উত্তাপআমার বুকের উত্তাপ কি আজ বাতাসের শরীরে গিয়ে মিশেছে ভাবী আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছে। প্রথম আমি যখন আমি বললাম, আমাকে তুমি করেই বলেন। সে বললো না সে আপনি করেই বলবে।  

‘আর বেশীক্ষণ না। আধাঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাবোবোরিং লাগছে খুব?  বোরিং লাগার কি আছে । দেশকে সেই চেনা রঙেই উপভোগ করেন।

‘ বাহ! বেশ কথা বলো তো তুমি। কবিতা লেখো নাকি? আধা ঘন্টা! ভ্যাপসা গরম ভাব লাগছে।  ড্রাইভার এসি টা একটু বাড়িয়ে দাও ভাই। অনেক দিন পর এলাম তো।

দীপ্ত ভাইয়া শিস দিতে দিতে বললেন, কণা এত অস্থির হচ্ছো কেন? হাতে আমাদের অনেক সময়। অনেকদিন এবার দেশে থাকবো আমরা। দেশে এসেছি। দেশের বাতাস টা একটু উপভোগ করতে দাও। পুরোনো সেই উত্তাপ। পুরাতন সেই আবেগ একটু চেখে দেখি।



দ্বীপ্ত ভাই স্বভাব শিল্পী। কথার মাঝের দুচার কলি গান গাওয়া তার পুরাতন অভ্যেষ। গুনগুনিয়ে একটা সুর ভাঁজা শুরু করলেন, “পুরোনো সেই দিনের কথা ভূলবি কিরে হায়...”

হায়! রবীন্দ্রনাথ, অস্থির কিছু গান লিখে গেছো তুমিআমার মনের সব কথা তুমি যেন আগে থেকেই পড়ে রেখেছিলে। আমার সব কথা খুঁজে পাই তোমার গানে। যখন যে ম্যুডে যে গান দরকার সবই খুঁজে পাই তোমার ভান্ডারে। পুরোনো দিনের কথা আমি ভূলতে পারিনি কখনো। পুরোনো দিনের কথা গুলো প্রাণের ব্যাথাগুলো সন্তানের মত লালন করি নিজের মাঝে।


আধা ঘন্টা নয়। পুরো একঘন্টা পরে বাসায় পৌঁছলাম। ক্যাবওয়ালা ভাড়া নিয়ে কিছু ক্যাচাল করলো। বাংলাদেশ কখনো কি মিটারে চলতে পারবে! নীতিবোধ কি আইন মানার প্রবণতা দিনদিন আমাদের মাঝ থেকে কমে যাচ্ছে। আর এত আইন মেনেই বা কি হবে। যস্মিন দেশে যদাচার। 

কনডোমের ছেঁড়া প্যাকেট

শেষ বিকেলের রোদের ছায়া বিছিয়ে আছে পিচ ঢালা কালো রাস্তার উপর্। টুংটাং ঘন্টা বাজিয়ে রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে কুলফি ওয়ালা। রাস্তার ফুটপাত ধরে পায়চারি করছে সুদর্শন এক কিশোর্। বয়স চৌদ্দ পনেরোর মত হবে। গায়ের রঙ পাকা আঙুরের মত । হলুদাভ আভা মন ছুঁয়ে যায়। টানা টানা দুই চোখে অদ্ভুত এক কামুক আহবান। চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে আমি ছেলেটাকে দেখছিলাম। দেখছিলাম না বলে রুপ সুধা গিলছিলাম বললেই ভালো হবে। চলার পথে অচেনা মানুষের রুপ দেখা আমার বহু পুরাতন অভ্যেষ। কারো চোখ, কারো ঠোট, কারো কোমরের গঠন মনে সুড়সুড়ি জাগিয়ে যায়। ছেলেটার মধ্যে, " আমাকে সবাই চায়, " টাইপের একটা ভাব আছে। তার ভাব দেখে আপন মনেই হাসছি।

সাদা একটা টয়োটা এসে থামলো। ছেলেটা হাসিমুখে এগিয়ে গেলো। মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক বসা ড্রাইভারের সিটে। হাত বাড়িয়ে তিনি দরজা খুলে দিলেন। ছেলেটা একটু মেয়েলি ভঙ্গিতে হেঁটে গাড়িতে উঠে বসলোআমার সামনের রাস্তায় পড়ে থাকা কিছু  শুকনো পাতা উড়িয়ে গাড়িটি সামনের মোড়ে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

বসন্ত বিকেলে মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। দোকানের রেডিওতে কি একটা গান বাজছে। শিল্পী খুব সম্ভবত এস ডি বর্মন। মনে পড়ে রুবি রায়, কবিতায় তোমাকে কত যে ডেকেছি গানটায় এক কিশোরের অব্যক্ত ভালোলাগা ফুটে ওঠে প্রতিটি কলিতে। আমার এই ভালোলাগাও কি সেই ভালোলাগার মত। দোকানে আমরা দুজন। আমি এবং চা দোকানী লিটু ভাই। অনেক দিন চা খাওয়ার ফলে লিটু ভাইয়ের সাথে বেশ আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সমকামী হওয়ার দরুন অন্য মানুষের চোখ দেখে সহজে বুঝতে পারি সে সমকামী কি না! লিটু ভাইয়ের চোখে অন্যরকম এক উদাসীনতা থাকে সব সময়। তবু আমি বুঝতে পেরেছি লিটু ভাই সমকামী ছিলেন। মাঝে মাঝে টুকটাক কথা হয়। ছেলেটাকে দেখে বলল,

- কত জনের সাথে যে গেলো এই পোলা!
- চেন নাকি তারে ?
- চেহারায় চেনা। প্রায়ই নিত্য নতুন লোকের সাথে গাড়িতে করে চলে যায়।
- পার্ট টাইম কাজ টাজ করে নাকি ?
- পার্ট টাইম দেহ বেঁচা কাজ করে বলে মনে হয়।
- আচ্ছা লিটু ভাই , তুমি সমকামী জগৎ থেকে কিভাবে বের হয়ে গেলে ?
- সে এক লম্বা কাহিনী।
- বলা যায় ?
- হুম। বলা যায়। আর কিছু না হোক জীবনে কিছু শিখতে পারবে আমার কাছ থেকে
- বলো।
- আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। দুই বোনের পর আমি একমাত্র ছেলে হওয়ায় অনেক যত্নে মানুষ হই। তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি । বড় দুলা ভাইয়ের ছোট ভাই নাসির বেয়াই  আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসে। রাতে এক সাথে ঘুমাতে হলো আমাদের দুজনকে। সেদিন রাতে হঠাৎ বৃষ্টি এলো। কাঁথা ছিলো না। ঠান্ডায় কুকড়ে শুয়ে রইলাম। নাসির বেয়াই আমাকে জড়িয়ে ধরে।  আমার বেশ আরাম লাগে। এক পর্যায়ে নাসির বেয়াই আমার সাথে সেক্স করে। সত্যি বলতে কি অনেক ব্যাথা লেগেছিলো। কিন্তু আমি বাঁধা দেইনি। পরের রাতে আমরা দুজন আবার মিলিত হয়। এভাবে কয়েক দিন হওয়ার পর নাসির বেয়াই চলে যায়। আমি নিজের ভিতর অন্যরকম এক শূন্যতা বোধ করতাম।

কলেজে পড়ার সময় আমি পুরোপুরি সমকামী দুনিয়ার রাস্তা চিনে যাই। বেশ ডাগর চেহারা ছিলো আমার্। সবাই পছন্দ করত। বাপের বয়সী বুইড়া খাটাস গুলা টাকা দিয়ে সেক্স করত। হাত খরচের টাকা পেতাম। আমিও প্রতিদিন কারো না কারো সাথে চলে যেতাম। বড়লোকের বিশাল বাঙলো বাড়িতে কিংবা হোটেলের অন্ধকার ঘরে পরপুরুষের হাতে নিজেকে সঁপে দিতাম। চিপে চুষে সবাই শেষ টাকাটি উসুল করা পর্যন্ত আমাকে ভোগ করত। পাপ তাপ এসব নিয়ে মাথা ঘামাতাম না। নিজে যে প্রস্টিটিউট হয়ে গেছি সেটকুও বুঝতাম না। চোখে রঙিন চশমা। দুহাতে টাকা ওড়াতাম প্রচুর ।

আগেই বলেছি যে যেভাবে খুশী আমাকে ভোগ করত। আমি বাঁধা দিতাম না। একবার শুধু বাঁধা দিয়েছিলাম। দুজন বিশাল দেহী যখন এক সাথে পুশ করার চেষ্টা করেছিলো। খদ্দেরদের অধিকাংশই সেক্স করার সময়ে কন্ডোম ব্যবহার করতে চাইত না। তাদের ধারণা কন্ডোম পরলে মজা কমে যায়। এটা কিন্তু ভুল ধারণা। তখন এগুলো বুঝিনি। বোঝার চেষ্টাও করতাম না।

একটা সময় শরীরের মাঝে  কিছু পরিবর্তন হতে লাগলো। আমি কি করবো ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। নিত্য নতুন লোকের সাথে সেক্স করতাম। তোমাদের এখন যেমন দেখি দু চারজন বন্ধু থাকে আমার সেরকম কেউ ছিলো না। হাজার পুরুষের সামনে কাপড় খুলেছি। এমনও হয়েছে যে একজন আমাকে করছে আর অন্যরা চেয়ে দেখছে। তখনও লজ্জা পাইনি। কিন্তু লজ্জা পেতাম ডাক্তারের কাছে এগুলো বলতে। ডাক্তারের কাছে বলতাম অনেক কিছু লুকিয়ে চুরিয়ে। ডাক্তার রোগ ধরতে পারত না। ভুল ওষুধ দিত। আমি ডাক্তারকে দোষ দেই না।

একটা সময় শরীর ভাঙতে শুরু করলো। আপেলের মত ফোলা গাল চুপসে আমসি হয়ে গেলো। যৌন রোগের শিকার হলাম। একি এভাবে তাকাচ্ছো কেন ! এইডসের কথা ভাবছো? না। এইডস না। এইডস ছাড়াও অনেক রোগ আছে। সিফিলিস, গনোরিয়া ইত্যাদি।



আইয়ে পাশ করেছিলাম শেষ পর্যন্ত। অনেক চেষ্টা তদবির করে রোগ সারলো কিন্তু শরীর আর সারলো না। দুর্বল লাগে। বুক ধুকপুক করে। অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যাই। আমাকে আর কেউ গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যায় না। আব্বা আম্মার সঞ্চয় অনেকটা খরচ হয়ে গেছে আমার পেছনে। বাড়ি খানা ছাড়া আর কিছু নেই।

- ইন্টার পাশে তো চাকরি বাকরি কিছু একটা জোগাড় করতে পারতে ? চায়ের দোকান দিলে কেন ?
- চাকরি। হুম। চাকরি একটা জোগাড় করেছিলাম। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার জন্য করতে পারিনি সেটা। আব্বা মারা গেলো। একটা কিছু তো করা লাগত। নাসির বেয়াই এই দোকানটা করে দিয়েছে ।
- নাসির , তিনি কি করেন।
- নাসির বেয়াই এখন অনেক টাকা পয়সার মালিক। অনেক দুর লেখা পড়া করে বড় চাকরি পায়। গাড়ি বাড়ি করেছে সে। ছেলে মেয়ে নিয়ে সুখে আছে। কলেজে পড়ার সময়ে নাসির বেয়াই অনেকবার আমার পিছে ঘুরেছে। আমি তখন তাকে পাত্তা দেই নি। অথচ আজ তার দয়ায় আমার দুইবেলা খাবার ব্যবস্থা  হয়েছে। জীবন এরকমই। কাল কি হবে তা আমরা কেউ বলতে পারি না। তাই অনিরাপদ সেক্স করে  ভুল করবা না।

সন্ধ্যার চাদরে মুড়ে যাচ্ছে প্রকৃতি। সামনের গলি থেকে একটা কুকুর ছুটে এলো। আমাদের পাশ কাটিয়ে সে দৌড়ে চলে গেলো। এবার উঠতে হবে। ঘরের পথ ধরলাম। দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো সেই গাড়ি । কিশোর ছেলেটা নেমে চলে গেলো। মধ্য বয়স্ক লোকটা গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, মামা চা হবে ? লিটু ভাই চা বানাচ্ছে এক মনে। চেহারায় সেই উদাস ভাব। বসে যাওয়া ফর্সা গালে কেটলির ভাপ লাগছে। মাথার ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। হেড ফোন লাগিয়ে নিলাম কানে। কানের ছিদ্র দিয়ে মাথার ভেতর কিছু গান ঢোকানো যাক।

ফরিদা পারভীন গেয়ে উঠলো লালন গীতি,


দিন থাকতে দিনের মর্ম কেন বুঝলে না, সময় গেলে সাধন হবে না।

লাইফ উইদাউট লাভ - পর্বঃ ০১

৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৪। ঢাকা বিমান বন্দর।
সন্ধ্যা ৭ টা ৪৩ বাজে। দীর্ঘক্ষণ বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে বসে হাঁটাহাটি করছি। এমনি সময়ে সাউন্ডবক্সে নারীকন্ঠের সুললিত কন্ঠস্বর আমার বুকের কাঁপন বাঁড়িয়ে দিলো। নিজের বুকের ধুকপুকুনি যেন নিজেই শুনতে পাচ্ছি। বিমানে চড়ার সুযোগ আমার কখনও হয় নাই। আর আজ আমি কোথাও যাচ্ছি না। যাওয়ার খুব বেশী জায়গা আমার অবশিষ্ট নেই। বিশাল এই পৃথিবী হঠাৎ করে আমার জন্য ছোট হয়ে গেলো কেমন করে তা আমি নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি একে একে আশপাশের অনেক কিছুই বদলে গেছে। আজ দীপ্ত ভাইয়া আসছেন। দীপ্ত ভাইয়া! সেই দ্বীপ্ত ভাইয়া। কৈশোরে যে ছিলো আমার কাছে এক রহস্যময় ব্যক্তিত্ব। জানা অজানা নানা তথ্যে সে আমার জ্ঞানকে করেছিলো সমৃদ্ধ। জ্ঞান পিপাসাকে দিয়েছিলো বাড়িয়ে। জীবনের প্রয়োজনে মানুষ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দ্বীপ্ত ভাইয়ার সাথে আমার যোগাযোগ নেই বছর দশেক হবেমাস তিনেক আগে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পেলাম। নাম দেখে চেনা চেনা লাগে। প্রোফাইল পিকচারে সাম্প্রতিক একটা ছবি। মুখের আদলটাও অনেক পরিচিত। কিন্তু তাতে কিছু মাংস জমে আগের সেই লাস্যময় ভাবটা অনেকটা কমে গেছে। তবে বয়সের তুলনায় এখনও সে অনেক তরুন আছে। বয়স তার কতই হবে! সাইত্রিশ কি আটত্রিশ। ফেসবুকে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। একদিন জানালেন তিনি দেশে আসছেন। আমি যেন রিসিভ করতে যাই। সপরিবারে নিউ ইয়র্ক থেকে ঊড়ে এলেন তিনি। ধীরে ধীরে যাত্রীরা লাগেজ ঠেলে বেরিয়ে আসছেন। আমি যাত্রী বহির্গমন পথের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

বামহাত বুকের উপর একবার বুলিয়ে নিলাম। হার্টবিটটাকে পারলে চেপে ধরে থামাতাম। এত জোরে বিট দেয়ার কি আছে! এখন কি আর সেই কৈশোরের মত নার্ভাস হওয়ার দিন আছে!  ট্রলি ঠেলে এগিয়ে আসছেন দীপ্ত ভাইয়া। একটু স্বাস্থ্য বেড়েছে এই যা কিন্তু ঠিক আগের মতই আছেন। ২০০০ সালে তাকে প্রথম যেমন দেখেছিলাম আজো যেন সেরকই মনে হচ্ছে। হালকা গড়নের এক তরুন মিয়াভাইয়ের হাত ধরে লঞ্চ থেকে নামলেন বানিয়াখালি লঞ্চঘাটে। শীতের রাতে কুয়াশাঁ জমে সব পিছল হয়ে ছিলো। পল্টুনে আমি আর রহিম দাঁড়িয়ে ছিলাম। রহিম দৌঁড়ে গিয়ে তাদের ব্যাগ ব্যাগেজ কাঁধে তুলে নিলো। আমি এগিয়ে গিয়ে সালাম দিলামভাইয়া তার বন্ধুকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, “দ্বীপ্ত, এ হচ্ছে শুভ্র। আমার ছোট ভাই।” দ্বীপ্ত ভাইয়া হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলেন।

দ্বীপ্ত ভাইয়ার দিকে আমি তাকিয়ে আছি। আমাকে দেখতে পেয়ে তিনি হাত নাড়ছেন। আমিও হাত নাড়ালাম। তার পেছনে একটা মেয়ে হেঁটে আসছে ফুটফুটে বাচ্চার হাত ধরে কণা ভাবির চোখে আনন্দের ঝিলিক। খুব সম্ভবত অনেক দিন বাদে দেশে আশায় মনে বাঁধ ভাঙা উচ্ছাস বোধ করছেন। অনেক দিন পরে দীপ্ত ভাইয়ের সাথে দেখা। এরই মধ্যে দশ বছর পেরিয়ে গেছেআমার তো মনে হয় এই সেদিনের ঘটনা। কিছুটা মুটিয়ে যাওয়ায় গোলগাল চেহারা হয়েছে দ্বীপ্ত ভাইয়ারবয়সের হালকা ছাপ পড়েছে কিন্তু চেহারা সেই আগের মতই আছে। আমি তার চোখের দিকে তাকালাম। সেই চোখ, চিরচেনা চোখ, যে চোখে আমি দেখিয়েছিলাম অন্য এক জগত।

আশপাশে অনেক মানুষের ভিড় ভিড় ভাট্টা আজকাল আর ভালো লাগে না। সবাই এসেছে অভ্যাগতদের রিসিভ করতে। কারো ছেলে, কারো স্বামী। প্রত্যেকের চোখে মুখে উপচে পড়া আনন্দের ঢেউ। আবার কেউ এসেছে অফিশিয়ালি রিসিভ করতে। তাদের হাতে প্লাকার্ড। পাশে দাঁড়ানো ছেলেটা প্লাকার্ড হাতে কিছুটা নার্ভাস ভঙ্গিতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে প্লাকার্ড দেখে বুঝলাম জ্যাসন ওয়াকার নামের কাউকে রিসিভ করতে এসেছে। কিছু দূরে একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে এক গোছা রজনীগন্ধা। বয়স পঁচিশ ছাব্বিশ এর কাছাকাছি। ফুলটুল আমার কিছু একটা আনা উচিত কিনা এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। দেখা যায় ছোট খাট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আমাকে প্রায়ই হিমশিম খেতে হয়।

দীপ্ত ভাইয়া কখন যে আমার সামনে এসে গেছে তা আমি মোটেও আমি টেরই পাইনি। কেমন আছিস? সেই চেনা কন্ঠস্বর। গত কয়েকদিনে স্কাইপে, ফোনে শুনেছি। কিন্তু আজ সরাসরি শোনার পর বুকের ভেতরটা মোঁচড় দিয়ে উঠলো। কিছু একটা বুকের ভেতর থেকে দলা পাকিয়ে উঠে গলায় এসে বেঁধে গেলো। কান্না! না, কান্না নয়। কাঁদতে আমি বহুদিন ভূলে গেছি। বুকের ভেতর কান্না জমে জমে শক্ত পাথর হয়ে গেছে। ইচ্ছে করছিলো দ্বীপ্ত ভাইয়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ি সেই এক বর্ষা ভেজা শেষ চৈত্রের সন্ধ্যায় যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু অচেনা একটা লজ্জা আমাকে অনড় করে দিলো। আমি বোবা চাহনিতে সেই চেনা চোখের দিকে চেয়ে থাকলামলাগেজটা পাশে সরিয়ে রেখে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। সেই চেনা স্পর্শ চেনা আলিঙ্গন। কিন্তু ভাবীর সামনে আমার আড়ষ্ঠ ভাব কিছুতেই কাটছিলো নাশুধু মনে হচ্ছিলো আমার শরীর থেকে ঘামের গন্ধ বের হচ্ছে নাতো। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে যে ঘামার সুযোগ নেই সেটা মাথায় আসছে না।

আলিঙ্গন দীর্ঘ হলো না। কোলাকুলি সেরে দীপ্ত ভাইয়া আবার জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছিস শুভ্র?

মাথা নেড়ে জানালাম, “ভালো আছি” সে কেমন আছে সেটা আর জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠে না।

‘চশমা নিয়েছিস কবে? মাথার চুলগুলো কোথায়? সামনে এত ফাঁকা কেন? হেয়ার ট্রিটমেন্ট করাস না কেনবাড়ীর খবর কি? সজল এর কি খবর?

একরাশ প্রশ্ন করে গেলেন। যদিও এর  অধিকাংশ উত্তর তিনি জানেন। ভাইয়ার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্ট থেকেই সে আমাকে খুঁজে বের করেছে। ভাইয়ার খবর সে জানবেনা এটা কিভাবে হয়! ফেসবুকের এই যুগে আমরা অনেক দূরে থেকেও কাছে থাকি। আবার কাছের মানুষ থেকে নিজের অজান্তে দূরে থাকি ফেসবুক যেমন দেয় তেমনি অনেক কিছু কেড়ে নেয়। ভাইয়ার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগেই ভাবী মুখ খুললেন।

‘হু হুহ! শুভ্র সাহেব। আপনি কি শুধু একজনকেই রিসিভ করতে এসেছেন। তবে কি আমরা ফিরে যাবো? আমাদের দিকে একটু তাকান প্লিজ। আপনার নাম অনেক শুনেছি। এবার কথা বলে ধন্য হই।

আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। আসলেই তো। একবার ভদ্রতা করেও ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করা হয় নাই। ভাবী আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। সে হাসিতে প্রশ্রয়ের ছাঁয়া। বোঝা যাচ্ছে ভাবী মোটেও রাশভারী কেউ নয়। ভাবীকে ছবিতে দেখেছি। দীপ্ত ভাইয়ার বিয়ের অনুষ্ঠানে আমি যাইনি। সংগত কারনেই যাইনি। সরাসরি ভাবীকে এই প্রথম দেখলাম। ছবির থেকেও ভাবী অনেক সুন্দরী। ভাবী আমারই বয়সী। বছর খানেকের বড় হতে পারে। তাদের যখন বিয়ে হয় আমি তখন ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি আর ভাবী এইচএসসি পাশ করেছেন সেই বছর। বিয়ের দশ বছর পর বাঙালী বধুরা মুটিয়ে যায়। মনে হয় একটা মাংসের স্তুপ। দুই বাঘে খেয়ে শেষ করতে পারবে না এমন তার সাইজ ভাবীকে দেখে মনে হচ্ছে বেশ ফিগার সচেতন এখনো চেহারায় লাবন্য ঝরছে। সিনেমায় নামলে শাবনুর মৌসুমিরা ফ্লপ সাইডে পড়ে যাবে একথা আমি হলপ করে বলতে পারি। ভাবীর কন্ঠস্বরের আন্তরিকতা আমাকে সহজ করে দিলোহালকা কথা বার্তাতেই ভাবীর সাথে ফ্রি হয়ে গেলাম। অথচ কাল রাত থেকে কতই না টেনশান করলাম। ভেবেছিলাম আমি ভাবীর সাথে সেভাবে কথা বলতে পারবো না।


দক্ষিণ আফ্রিকার এক তরুনের করুন কাহিনী।

ছেলেটির বয়স ২০ বছর। নাম কি ছেলেটার? নাম না হয় অজানাই থাক। গাঁয়ের রঙ বলে দিচ্ছে সে নিগ্রো। দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা। দক্ষিণ আফ্রিকা হচ্ছে নেলসন ম্যান্ডেলার দেশ। পৃথিবীর হীরার খনি। পৃথিবীর সব থেকে বেশী বর্জপাত হয় আবার এই দক্ষিণ আফ্রিকায়। ছেলেটি পড়ার জন্য চলে এসেছে রাশিয়া। রাশিয়ার একটি শহরের নাম বেলগ্রেড। সে পড়ত বেলগ্রেডের শুখভ স্টেট টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে।

কালো ছেলেটি সমকামী ছিলো। তোমরা অনেকেই জানো রাশিয়ায় সমকামী বিদ্বেষ কতটা মারাত্মক। পুতিনের দেশ রাশিয়া ঘৃণা করতেই ওস্তাদ। তারা কালোদের ঘৃণা করে, তারা মুসলমানদের ঘৃণা করে, তারা সমকামীদের ঘৃণা করে। তাদের ঘৃণার অন্ত নাই। এই রাশিয়ায় এসে  নিগ্রো ছেলেটি ভূক করে এক ফাঁদে পা দিয়ে বসেছে।  সে ১৫ বছর বয়সের একটি ছেলের সাথে সাথে তার আলাপ হয় ইন্টারনেটে। দেখা করার জন্য একদিন সরল বিশ্বাসে ছেলেটি তার ফ্লাটে যায়।  আসলে সেখানে ১৫ বছর বয়সের কোন ছেলে ছিলো না। ছিলো রাশিয়ার একটি এন্টি গে গ্রুপ। তারা কৌশলে ছেলেটিকে ঐ ফ্লাটে নিয়ে আসে। সেখানে ছেলেটিকে তারা হেনস্তা করে একটি ভিডিও তৈরী করে। পরে ভিডিওটি তারা রাশিয়ার সামাজিন মিডিয়া ওয়েবসাইট ভিকে তে ছেড়ে দেয়। ভিডিওটিতে দেখা যায় তারা ছেলেটিকে তার যৌন পরিচয় নিয়ে জেরা করছে। তাকে দিয়ে স্ট্রিপ নাচ নাচাচ্ছে। জোর করে তাকে ন্যাঁড়া করে দিলো। এরপর একটা তরমুজ নিয়ে তাকে নাচতে  হচ্ছে। একপর্যায়ে তরমুজটি তার মুখের উপর ভেঙে ফেলল। ছেলেটির হাত দিয়ে তার মুখে এক নাগাড়ে চড় থাপ্পড় মারা হলো। তার গাঁইয়ের রঙ নিয়ে বারবার বিদ্রুপ করা হচ্ছে। দলের এক মহিলা সদস্য ছেলেটাকে বিড়ালের সাথে যৌনমিলন করার পরামর্শ দিলো।

অনলাইনে ভিডিওটি প্রকাশ হুয়ার পরে শুখভ স্টেট টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি ছেলেটি তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেছে। এখন খুব সম্ভবত ছেলেটিকে কোন ডিগ্রি ছাড়াই তার নিজের দেশে ফিরে যেতে হবে।


বাংলাদেশে  সমকামী বিদ্বেষ চোখে পড়ার মত। যদিও এখানে এখনো সেভাবে কোন এন্টি গে গ্রুপ গড়ে ওঠেনি। গড়ে না উঠুক এই আমাদের প্রত্যাশা। তবে যারা অনলাইনে পরিচয়ের পর সাক্ষাৎ করতে যাও তাদেরকে বিশেষ সতর্ক থাকার আহবান জানাচ্ছি। 

ইতালীয় যুবকের আত্মহত্যা।

২৭ অক্টোবর ২০১৩। রোমের পুরাতন একটি পাস্তা ফ্যাক্টরির ১২ তলায়  দাঁড়িয়ে আছে সাইমন। ইতালিয় উচ্চারন সিমোন। সাইমনের বয়স ২১ বছর। সে মেডিকেলের ছাত্র। ইতালির সর্ববৃহৎ সরকারী হাসপাতাল পলিকিলিকো আমবারতো তে সে ইন্টার্নশিপ করছে। পৃথিবীটা আজ সাইমনের কাছে বড় অসহ্য মনে হচ্ছে। মানসিক কষ্ট  তাকে চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। সে সুইসাইড হটলাইনে অন্তত দশবার ফোন করেছে। কোন কিছুতে সমাধান না পেয়ে সে পাস্তা ফ্যাক্টরির ১২ তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে। বড় অভিমান করে সে পৃথিবীকে ছেড়ে গেলো। রোমের রাস্তায় সেও বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে ভালোবাসতো। দলবেঁধে পাস্তা খাওয়ার স্মৃতি নিয়ে টিকে আছে নাস্তার টেবিলগুলো।

৬ নভেম্বর ২০১৩। ইতালীয় পুলিশ সাইমনের আত্মহত্যার কারণ উদঘাটন করতে পেরেছে। সাইমন এন্টি-হোমোফোবিয়া যোগাযোগ কেন্দ্রকে জানিয়েছিলো, “যারা সুইসাইড করেছে আমি তাদের কষ্টগুলো অনুধাবন করছি।”

সাইমনের ফোন কল গুলো গত দুই মাসে ধারণ করা হয়েছে। একটিতে সে জানিয়েছে, “আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। আমি যখন করিডোর দিয়ে হেঁটে যাই, আমার সহপাঠীরা আমাকে ফ্যাগট (বিদ্রুপ অর্থে সমকামী) বলে ক্ষেপায়। আমাকে নিয়ে তারা কৌতুক করে।”

আরেকটি ফোনকলে সে জানায়, “আমি এই সব কৌতুক আর বৈষম্যে হতাশ। আমার স্কুল জীবন থেকেই এটা শুরু হয়েছে। হাই স্কুলেও এটা ঘটেছে এবং এখন বিশ্ববিদ্যালয়েও একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমাকে যেতে হচ্ছে।”

মৃত্যুর আগে সাইমন সুইসাইড নোটে লিখে গেছে, “ আমি সমকামী। ইতালী একটি মুক্ত দেশ কিন্তু এখানে হোমোফোবিয়া (সমকামীদের ঘৃণা করা) আছে। যাদের মধ্যে এই আচরণ আছে তারা অবশ্যই তাদের বিবেকের সাথে বোঝাপড়া করা উচিত।”

রোমের পুলিশ অভিযুক্তদের ধরার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেইতালীয় পত্রিকা “কুরিয়েরে দেল্লে সেরা” জানিয়েছে , প্রকৃত অভিযুক্তদের ধরা অনেক কঠিন একটি কাজ।


সাইমন ঠিক লিখে গেছে। বিবেক দিয়ে মানুষের বোঝা উচিত। অন্যের কষ্টগুলো। অন্যের ব্যাথার জায়গাগুলো। আমাদের সামান্য মজার কারনে যেন অকালে সাইমনদের ঝরে পড়তে না হয় পৃথিবী থেকে।  আমাদের বাংলাদেশে রাতুলেরাও ঝুলে পড়ছে ফ্যানের সিলিং এ। কবে দূর হবে বৈষম্য? কবে প্রতিষ্ঠিত হবে সমধিকার! 

আগ্রহ

দুই বন্ধু ফোনে কথা বলছেখুব ভালো বন্ধু তারা। নিজেদের প্রায় সব কথা শেয়ার করে তারা। ফারহান ও শুভ। ফেসবুকে পরিচয় হলেও এখন তার ব্যাপ্তি পৌঁছে গেছে বাস্তব জীবনেও। ফারহান থাকে পুরান ঢাকায় আর শুভ মিরপুরে। ব্যস্ত কর্মজীবনে দেখা হয়না খুব একটা। তাই কথা যা হয় ফোনেই হয়। শুভ্রও তাদের একজন ভালো ফ্রেন্ড। শুভ্র সবসময় শুভকে টিউবলাইট বলে খ্যাপায়। শুভ’র দৃষ্টিতে এটা খুবই খারাপ একটা কথা। কিন্তু শুভ্র হারামীটা কোন নিষেধ শোনে না। হাজার বার বারণ করার পরেও তাকে টিউব লাইট বলে খেপাবে। শুভ স্বীকার করুক আর নাই করুক। টিউব লাইট বলার পেছনে যুক্তি সঙ্গত কারণ তো অবশ্যই আছে। শুভ সব কিছু দেরীতে বোঝে। শুভ’র মুডটা এমনিতে আজ ভালো না। তাই সে চাচ্ছিলো না শুভ্র হারামীটাকে ফোন করতে। ফোন করলেই তো টিউব লাইট টিউব লাইট বলে ঢং শুরু করবে।
                          
সেদিক থেকে ফারহানকে ফোন করা যায়। ফারহান বেশ ঠান্ডা মাথার ভদ্র একটা ছেলে। এটলিস্ট সিরিয়াস বিষয় নিয়ে সে শুভ্র গাধাটার মত ফান করে না। ফারহান ঘুমাচ্ছিলো। খোদার খাসি। কাজ কাম নেই। শুধু খায় আর ঘুমায়। ফারহান ঘুম জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করলো, কি রে শুভ কি খবর তোর, সব কিছু ভালো!

শুভঃ ভালো আর থাকি কিভাবে দোস্ত।
ফারহানঃ কেন কি হয়েছে?
শুভঃ দোস্ত আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, আমার বয়ফ্রেন্ড আর আগের মত আমার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সে রেগুলার টায়ার্ড থাকে। খুব টেনশান হচ্ছে।
ফারহানঃ টেনশান করিস না। ঠিক হয়ে যাবে।
শুভঃ কিভাবে ঠিক হবে, কবে ঠিক হবে। টেনশান না করে থাকি কিভাবে বল!
ফারহানঃ আর রাতেই ঠিক হবে।
শুভঃ তুই কিভাবে জানিস?
ফারহানঃ বললে তুই মাইন্ড করবি।
শুভঃ করবো না।
ফারহানঃ প্রমিজ!
শুভঃ প্রমিজ।
ফারহানঃ আজকে রাতে আমার বয়ফ্রেন্ড ইন্ডিয়া থেকে দেশে ফিরবে।



( ফারহান ও শুভ, আমি জানি এই গল্প পড়ার সময় তোরা আমার উপর ১০৪ ডিগ্রি উত্তাপে খেপে থাকবি। দোস্ত তোরা তো জানিস এটা তোদের গল্প নয়। আমার মত বদ পাব্লিকের মাথা থেকে উৎপন্ন গল্প। জাস্ট যদু মধুদের নাম না ব্যবহার করে তোদের দুজনের নাম ব্যবহার করেছি। তোদের দুজনের জন্য আন্তরিক শুভ কামনা)

পরিবার

আজকাল মতিঝিলের দিকে বেশ যাওয়া হয়। ওখানকার একটা রেস্টুরেন্টে গরুর শিক কাবাব খেতে জুড়ি নেই। কাবাবের লোভেই মূলত যাই। আর যাই আসিফের সাথে আড্ডা দেয়ার লোভে। আসিফ মজার মানুষ। আমাদের কমিউনিটির লোক। মজার মজার গল্পে মাতিয়ে রাখে পুরোটা সময়। মধ্যবয়সী সুদর্শন একজন মানুষ আসিফ। চেহারা দেখে অবশ্য বোঝা যায় না যে সে পঞ্চাশ পার করেছে অনেক আগেই। শারীরিকভাবে সে বেশ শক্ত সামর্থ্য পুরুষ। তার সাথে রমণে আগ্রহী কিউট ছেলেরা আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারো। আমি আসিফের সাথে মিলিয়ে দেব। একদিন আসিফ এলো , চেহারায় তার বিমর্ষ ভাব। বোঝা গেলো কিছুটা মাতাল অবস্থায় আছে। ঘাটাবো কি ঘাটাবো না বুঝতে পারলাম না। ইতঃস্তত করলাম খানিকখন। বয়সের তফাৎ হলেও আমরা দোস্ত মানুষ। তার সমস্যা আমার শোনা উচিত। কাঁধে হাত রেখে বললাম, দোস্ত, কোন সমস্যা।

আসিফ চোখ তুলে আমার দিকে তাকালো। মদের প্রভাবে চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে আছে। শোনা যায় না প্রায় এমন স্বরে বলল, দোস্ত আমি গে হতে পারি কিন্তু আমার সন্তান গে হবে কেন! বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পিতা হয়ে পুত্রের গে হওয়াটা তো আমি মেনে নিতে পারিনা। গে জীবন কি সুখের জীবন। ছদ্ম সুখের অভিনয় করে যেতে হবে স্ত্রী পুত্রের সাথে সারাজীবন। আমার ছোট ছেলে আজ আমাকে জানালো সে গে। তার থেকে ও স্ট্রেইট হয়ে জন্মালো না কেন!

মাতালকে সান্তনা দেয়া আর না দেয়া সমান কথা । আমি চুপ করে রইলাম।

পরের সপ্তাহে আসিফ একই অবস্থায় এলো। আমি  একই ভাবে তার কাছে কারণ জানতে চাইলাম। আসিফ জানালো, আজ দুপুরে সে জানতে পেরেছে তার বড় ছেলেও সমকামী। আমি পুরো বোকাচুদা হয়ে গেলাম। অনেক কষ্টে হাসি দমন করে তাকে বললাম, দোস্ত তোমার ফ্যামিলিতে তাহলে তো মেয়ে পছন্দ করে এমন কেউ নেই।

আসিফ দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, না আছে। তিনি আমার স্ত্রী।

{ এই জোকস উৎসর্গ করলাম আমার একজন  ভালো মনের ম্যাচিউরড বন্ধুকে যার ফেসবুক নাম আসিফ তাসিন। যদিও গল্পের সাথে তার ব্যক্তিজীবনের কোন মিল নেই। সে বিবাহিত। সে জন্যই তার নাম বেছে নিতে ইচ্ছে করল। }


পুত্র গর্ব

খুলনা পাবলিক কলেজের গেটে এসে নামলাম। মধ্যবয়সে এসে আরো একবার সেই কৈশরের অনুভূতি ফিরে এলো। কৈশরে এসেছিলাম বাবার হাত ধরে। আমি গ্রামের ছেলে। এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাবলিকে এসে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে চান্স পাই। দারোয়ানকে পরিচয় দিতে  একাদশ শ্রেনীর ক্লাসে পাঠিয়ে দিলো। চারপাশে অচেনা সব নতুন মুখ। এতদিনে স্কুলের অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়ে গেছে। নতুন বিল্ডিংও হয়েছে একটা। পুরাতন ভবন আজো আছে। আজকেও অধিকাংশ মুখ অচেনা। আজ রিইউনিয়ন। বিভিন্ন ব্যাচের ছেলেরা এসেছে। চেহারা দেখে আর চেনার জো নেই। নিজের ব্যাচের ছেলেদের অনেককেই চিনতে পারলামআবার অনেকের নাম শুনে চেনার চেষ্টা করেও পারছি না। কি ছিলো আর কি হয়ে গেছে। তারপরও নস্টালজিক একটা দিন কেটে গেল। খুব কাছের চার বন্ধু গোল হয়ে বসলাম সেই পুরোনো সেই ক্লাস রুমে। এখানেই আলাল স্যার, লতিফ স্যার, ইউসুফ স্যার, বদু স্যার, টিপি ম্যাডাম কত ক্লাস নিয়েছেনরিইউনিয়নে টিপি ম্যাডামও এসেছেন। রিটায়ার্ড করেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ এলেও সাজগোজে তিনি এখনো অনেক স্মার্ট, হেব্বি ফিটফাট। আমাকে ডেকে বলল, ঐ শুভ্র , তুই কি এখনো সেই রকম লাজুক আছিস নাকি!

এই প্রথম কেউ তুই বলল, ভালো লাগলো। বন্ধুরা প্রায় সবাই তুই থেকে তুমি তে উঠে গেছে।  সৌমিত্র, সাজু, রাসেল আর আমি গিয়ে বসলাম আমাদের সেই ক্লাসরুমে। আমরা ছিলাম বি গ্রুপের। এখন তো দুই শিফটে স্কুল চলে। আমাদের সময়ে একটাই শিফট ছিলো। ডে শিফট। গল্পের পর গল্পের তুবড়ি ছুটছে। এই বয়সের বাপদের একটা প্রব্লেম আছে। গল্পের মাঝে নিজের ছেলে মেয়েদের কথা তুলবেই। আমার বোর লাগে। আমি ফেসবুকে স্ট্যাটাস আপডেট করতে লেগে গেলাম। স্ট্যাটাসের বন্যা বইয়ে না দিয়ে আমি আবার বের হতে পারিনা।
সৌমিত্র তার ছেলের প্রশংসা করে বলছে, আমার ছেলে বড় চাকরী করে তো জানো। সে তার বন্ধুদের প্রতিও অনেক কেয়ারফুল। গত মাসে তার ক্লোজ এক বন্ধুকে সে তাদের কোম্পানীতে উচ্চ বেতনে চাকরী পাইয়ে দিয়েছে।

সাজু বলল, আরে আমার ছেলেও অনেক বন্ধুবৎসল। গত মাসে তার বন্ধুকে বিএমডব্লিও গিফট করেছে।

নাজমুল আরেক কাঠি সরেস। সে বলল, আরে আমার ছেলে পারলে তো তার জানটাই বন্ধুর জন্য দিয়ে দেয়। গতমাসে সে তার বেস্ট ফ্রেন্ডকে গুলশানে একটা বাড়ী কিনে দিয়েছে।

এবার আমার বলার পালা। আমি চুপ করে আছি। তিনজনে আমার দিকে উৎসুক নয়নে তাকিয়ে আছে। নিজের সাফল্য বন্ধুদের থেকে ছাড়িয়ে গেলে আমরা সবাই অন্যরকম একটা তৃপ্তি অনুভব করিযদিও কখনোই সেটা মুখে স্বীকার করব না। তাদের মুখের রেখায় সেই ধরণের একটা ছায়া আমি দেখতে পেলাম।

সৌমিত্র বলল, কিরে তোর মাথা থেকে এখনো ফেসবুকের পোকা নামেনি! মার্ক জ্যুকারবার্গ শুনলাম ফেসবুক ব্যবহার করে বোর হয়ে গেছে। তাই সে এখন ট্যুইটার ইউজ করে।

আমি বললাম, আমার ছেলেটা গ্রাজুয়েশন করার পরে ভালোই আছে। তোমরা মনে হয়  জানো না আমার ছেলে সমকামী। সেটা নিয়ে প্রথমে আপত্তি করেছিলাম। এখন মেনে নিয়েছি। তবে তোমরাও স্বীকার করতে বাধ্য হবে আমার ছেলের বন্ধুভাগ্য অনেক ভালো। আমার ছেলে গতমাসে তার তিন বয়ফ্রেন্ডের কাছ থেকে ভালো বেতনের চাকুরী, বিএমডব্লিউ গাড়ী আর গুলশানে বাড়ী পেয়েছে।  তার তিন বয়ফ্রেন্ডের ছবিও আমার কাছে আছে। দেখবে। 


ছবি দেখার পর তিন গর্বিত পিতা চুপসে গেলো। কেন ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমার ছেলে সমকামী এটা স্বীকার করেছে বলে তোমরা ছি ছি করছ, তোমাদের সোনার চাঁন , পিতলা ঘুঘু গোপনে কি করে তার কোন খবর রেখেছ কখনো! 

চাপাবাজি

এ কথা সবাই স্বীকার করবেন যে চট্টগ্রামের লোক একটু বেশী চাপাবাজ। যদিও তারা বিছানায় চাপার বদলে চাপ খেতে বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে কিন্তু তাদের মুখের চাপাবাজির জন্য জগৎবিখ্যাত। চট্টগ্রামে আমার কয়েকটা ভালো বন্ধু আছে। ঈদের ছুটি কাটানোর জন্য ভাবলাম যাই চট্টগ্রাম থেকে একটা ট্যুর দিয়ে আসি। যদিও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত হলুদ দিয়ে রান্না তরকারী খেতে আমার জান বেরিয়ে যায়। কিন্তু ওদের হাতে তৈরী শুটকি টা অওসাম লাগে খেতে। হোটেল থেকে বেরিয়ে পতেজ্ঞা সি বিচে যাচ্ছি হাওয়া খেতে। বেরোনোর ঘন্টা খানেক আগেই বাপ্পী আর ধ্রুব কে ফোন করে দিয়েছিলাম। ওরা নিশ্চয়ই এসে গেছে। বাপ্পী এখানকার লোকাল। সে কবিতা টবিতা লেখে প্রায়ই। কবিতা লিখে ফেসবুক ওয়ালে বন্যা বয়ে দেয়। ধ্রুব কক্সবাজারের ছেলে। সে কবিতা টবিতা লিখতে পারেনা। তার দ্বারা শুধু টয়লেটে হিসু করেই বন্যা বইয়ে দেয়া সম্ভব। তবে বাপ্পীর একটা খুব ভালো গুন আছে। তার এলাকায় গেলে তার বাসায় থাকা খাওয়া এবং আরো অনেক কিছুই ফ্রি। প্লিজ কোন ত্যাদোড় পাবলিক অনুগ্রহ করে আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না আমি ধ্রুব’র বাসায় কয়বার গেছি এবং এক বাক্যে প্লিজ ও অনুগ্রহ একই সাথে ব্যবফার করেছ কেন। ধ্রুব এবং বাপ্পী খুব ভালো বন্ধু। তারা আবার বংশ গরীমা নিয়ে ভালই নাক উঁচু স্বভাবের। আমি দূর থেকে দেখতে পেলাম দুই বান্দা বিচে আগে থেকে হাজির।

আমি হাত নেড়ে ইশারা করলাম। দুই বান্দা খেয়ালই করল না। প্রকাশ্যেই দুই বান্দা আবার লাগালাগি শুরু করে দিয়েছে। তাদের উচ্চকন্ঠ শোনা যাচ্ছে। ধ্রুব’র কথায় আঞ্চলিক টান আছে। সেদিক থেকে বাপ্পীর কথা অনেক পরিষ্কার। লাগালাগি বলায় অন্য কিছু ভেবে বসেননি তো। আরে এটা আমাদের আঞ্চলিক কথা। ঝগড়া করাকে আমাদের এলাকায় বলে লাগালাগি। আর আপনারা যেটাকে লাগালাগি বলেন আমাদের এলাকায় ওটাকে বলে চু******। বাপ্পী বলছে, “ঐ যে পোর্ট টা দেখতে পাচ্ছিস। জানিস ঐ পোর্ট এলাকা প্রথম কারা আবিষ্কার করে! জানবি কিভাবে মুর্খ ছেলে। আমাদের বংশের পূর্বপুরুষেরাই এই এলাকার পত্তন করে। ”

বলেই সে এমন এক খানা ভাব নিলো যে সে ধ্রুবকে হারিয়ে দিয়েছে। কিন্তু চাপাবাজীতে কি কক্সবাজারের লোক কম যায়! ধ্রুব গলার স্বর আরো উচ্চগ্রামে বাড়িয়ে বলল, “আরে রাখ তোর পোর্ট। প্রথম সেক্স কারা আবিষ্কার করে জানিস। (বুকে চাপড় মেরে বলল) এই ধ্রুব’র পুর্বপুরুষেরাই প্রথম সেক্স আবিষ্কার করে। ”

আমি দুইটার কথা শুনে পুরাই টাশকি খায়া গেলাম। কয় কি পাবলিকে! আমার বংশ তাহলে আইলো কই থিকা। বাপ্পীর উপস্থিত বুদ্ধি বেশ প্রখর। সে পালটা বান মারল, “ আমি স্বীকার করছি যে তোরা সেক্স আবিষ্কার করেছিস। কিন্তু একথা নিশ্চয়ই অস্বীকার করবি না যে মেয়েদের সাথে সেক্স করা যায় এটা প্রথম আবিষ্কার করেছে আমার বংশের লোক।”


{কি বন্ধু কেমন মজা পাইলা এই পর্বে? ভালো মন্দ লিখে জানাও। আজকের পর্বটি উৎসর্গ করলাম আমার দীর্ঘ দিনের দুই ফেসবুক কবি বন্ধু সুপার্ব বাপ্পী এবং গ্যাস্ট্রিক ধ্রুব তারা কে। }